শনিবার , এপ্রিল ১৩ ২০২৪
শিরোনাম
Home / শিক্ষা-সাহিত্য / ঋণশোধ। মনে পড়ে যায় ================ অধ্যাপক কুন্তল বড়ুয়া।

ঋণশোধ। মনে পড়ে যায় ================ অধ্যাপক কুন্তল বড়ুয়া।

নির্জনতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। নির্জন সময়ে ফেলে আসা কতো কথাই উঁকি মারছে মনের কোনে। নির্জনতা মানুষকে জাগ্রত করে। চলন্ত, ছুটন্ত মানুষকে কোনভাবেই বশ মানানো যায় না।
করোনা ভাইরাস আমাদের বাধ্য করেছে ইচ্ছাবন্দী করে রাখতে। ইচ্ছাবন্দী শব্দটা ইচ্ছা করেই প্রয়োগ করেছি।
বন্দী থাকতে থাকতে যদি আমাদের বোধদয় হয় আরকি। আমরা মানুষরা বড় বেশী আত্মসুখে মগ্ন থাকতে পছন্দ করি। ইতিহাস, অতীত বা ফেলা আসা সব অর্জনকে ব্যর্থ করে দিতে আমাদের জুড়ি নেই। তাতে আমরা বড় আনন্দ পাই বা তৃপ্ত থাকতে পছন্দ করি।
ফ্লাস ব্যাক
=======
মনে পড়ে যায়, এই চট্টগ্রামে কতো গুণী মানুষকে আমরা হারিয়েছি। অথচ আমাদের হিসেবের খাতায় আমরা ওঁদের নাম তুলে রাখিনি-
হারিয়েছি ওস্তাদ নীরোদ বরণ বড়ুয়াকে, যিনি অসংখ্য গুণী সংগীত শিল্পী তৈরী করেছিলেন। ওঁর কথা কেউ মনে রাখিনি।
পন্ডিত মিহির কুমার নন্দী যাঁর ধ্যান ছিলো শুদ্ধ রবীন্দ্রসংগীত চর্চা ও প্রসারে, তাঁর কথা কী আমরা মনে রেখেছি? রাখিনি, রাখতে চেষ্টা করেনি। ভূলে যাওয়াতে যেন আনন্দ আমাদের।
রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চৌধুরী অকালে চলে গেলেন পরপারে। একটি বার ও তাঁর কথা মনে করেননি আমাদের শিল্পী সমাজ।
“বইঘর” র প্রকাশক ও সত্বাধীকারী সৈয়দ মোহাম্মদ শফি সাহেবের কথা মনে আছে? না কারো মনে নেই! তিনি শুধু আধুনিক প্রকাশকই ছিলেন না, ছিলেন বাংলাদেশের অনেক কবি, সাহিত্যিক, ছড়াকারদের ভরসার স্থল।
চট্টগ্রামে চারুকলা ও শিল্পসংস্কৃতি চর্চায় তাঁর অবদান অপরিসীম। চট্টগ্রামে যে শিল্পকলায় আমরা শিল্প, সাহিত্য চর্চা করি এ শিল্পকলা প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর অবদানের কথা কি আমরা জানি? জানা নিশ্চয় আছে, কিন্তুু কিছুই করিনি, সম্ভবত ১৯৭৭ সালে ” সাহিত্য পরিষদ’র” ব্যানারে চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমীর যাত্রা শুরু। তাঁর প্রয়াণ দিবসে একটি বারের জন্যও আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাই না। কতো অকৃতজ্ঞ আমরা, কতো নীচ, কতো সার্থপর।
প্রবীণ সংগঠক, সংস্কৃতি কর্মী ডাঃ কামাল ই খান। বাংলাদেশ বেতারের প্রথম প্রযোজক চট্টগ্রামের। ৭০/৮০/৯০ দশকে চট্টগ্রামে যতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে সব অনুষ্ঠানে তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকার কথা আমরা জানি। নাটক তো বটে,
যেকোন প্রগতিশীল আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ আমরা দেখিছি। তাঁর কথা আমরা মনে রাখিনি, রাখার চেষ্টাও করেনি। স্মরণ সভা তো দূরের কথা, নামটিও মুখে আনি না।
একুশে পদক প্রাপ্ত নৃত্যগুরু রুনু বিশ্বাসকে মনে আছে তো? যিনি চট্টগ্রামের নৃত্যকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত তৈরী করে দিয়েছিলেন। আলাউদ্দিন ললিত কলার মাধ্যমে। নৃত্যগুরু রুনু বিশ্বাস এর ১০০ বছর পূর্ণ হলো। শতবার্ষকী উদযাপন করবে এমন আয়োজন তো চোখে পড়ে না। ধিক, ধিক বর্তমান সময়কে।
সুচরিত চৌধুরী? তাঁর কি অবদান আমরা কি জানি না। কি করতে পেরেছি আমরা। কিছুই পারিনি। আর পারবোও না।
গণসংগীত শিল্পী হরিপ্রসন্ন, রবিন দে তাঁদের কথা মনে আছে তো? গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে উদাত্ত কন্ঠে গণসংগীত পরিবেশনা। এঁরা আমাদের চেতনার, বোধের শিল্পী। চট্টগ্রামে শুদ্ধ সংস্কৃতির বাতিঘর। অথচ কি অদ্ভুতভাবে আমরা ভুলতে বসেছি তাঁদেরকে।
ভুলতে বসেছি গীতিকার আবদুল গফুর হালী, শেফালী ঘোষ, শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব। এঁরা মা,মাটি এবং জনগনের শিল্পী। আমরা আস্তে-আস্তে তাঁদেরইও ভুলে যাব।
বিণয় বাঁশী জলদাশ দারিদ্রকে সংগে নিয়ে যিনি তালবাদ্য বাজিয়ে আমাদের মুগ্ধ করেছেন। আহা কত সুন্দর বলে হাততালি দিয়েছি, প্রশংসা করেছি। কাঁধে ঢোল ঝুলিয়ে দশ আঙ্গুলে
যখন বোল তুলতেন আমরা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে তাকতাম।
দারিদ্রতা নির্মম কষাগতেও ছন্দ,তাল,লয়ে কমতি ছিলো না। তাল বাদ্য বাজিয়ে তিনি যখন গ্রামের বাড়ীতে ফিরতেন ক্লান্ত দেহ টেনে টেনে তখন ফতুয়ার পকেট হাহাকার। পেটে ক্ষিদে স্বপ্ন বিহীন আগামী তাঁর। তারপরে ও কাল আবার অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি। শেষ জীবনে মেডিক্যালে যখন বিনা চিকিৎসায় কাতরাছেন তখন আমরা বহুদুরে।
কবিয়াল ফণি বড়ুয়া, যিনি হাঁটতে বসতে ছন্দ বানাতেন। কবি গান করে সমাজের সব দুষ্ট ক্ষত ও বৈষম্যকে আমাদের সামনে তুলে ধরতেন আমার হা হা, হি হি করে বাহ্বা দিতাম।। তাঁকে ও আমরা যোগ্য সম্মান টুকু দিতে পারেনি।
যদি ও রাষ্ট্র এ দুজনকে ” একুশে পদক ” এ সম্মানিত করে আমাদের দায়মুক্ত করেছেন। কিন্ত কঠিন বাস্তব আমরা চট্টগ্রাম বাসীরা শ্রদ্ধা, স্মরনে কিংবা সম্মানে রাখিনি তাঁদের।
আমরা হয়তো ভুলতে বসবো হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোকে, যাঁরা একসময় নাট্য অংগনকে মাতিয়ে রাখতেন। হারিয়ে গেছেন- নাটকের মানুষ, অভিনেতা, নির্দেশক ও সংগঠক সুখেন্দু ভট্টাচার্য, মাহবুব হাসান,অধ্যাপক চৌধুরী জহুরুল হক, অলক দত্ত, মিয়া আবদুল জলিল,রণজিৎ রক্ষিত, কামরুল, স্বপন দাশ, আলি শাহ্, শৌভনময় ভট্টাচার্য তরুন নাট্যকর্মী রুমেল বড়ুয়া, বোধনের পঞ্চানন চৌধুরীকে।
সদ্য হারিয়েছি নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত শিল্পী শান্তনু বিশ্বাস কে। যাঁকে বড় বেশী প্রয়োজন ছিলো আমাদের। অকালে নির্ভার করে চলে গেলেন তিনি।
মুধুদা চট্টগ্রামে যিনি নাটকে রুপ-সজ্জা করতেন। সে পুরাতন টিনের বাক্সে সব কিছু নিয়ে যেতেন। তারপর চরিত্রানুযায়ী রুপ-সজ্জা করে দিতেন।’ অঙ্গন ‘ এর একটি নাটকে তাঁকে নিয়ে গান ও বানিয়েছিলেন নাট্যকার মিলন চৌধুরী। ব্যাস এ পর্যন্ত। আর কাউকে শুনিনি এ নেপথ্য শিল্পীকে সম্মান জানাতে।
আওয়ামী শিল্পী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা গীতিকার, সুরকার, শিল্পী অশোক সেনগুপ্ত। স্বৈরচার বিরোধী আন্দোলনে যাঁর সাহসী অংশগ্রহণ আমাদের দেখা। কত নিদারুন যন্ত্রনায়
বেদনায় কেটেছে তাঁর শিল্পীজীবন। আমরা কিছুই করতে পারিনি আমরা।
নির্মম নির্জনতায় হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোকে খুব বেশী মনে পড়ে আজ। একটু শ্রদ্ধা ভালোবাসা আমরা কি দিতে পারি না। দেখুন না কিছু করা যায় কি না? তাহলে আমরা পরের প্রজন্মের কাছে
সম্মানিত হবো। দায় আছে আমাদের। কর্তব্যও আছে। কিন্তু দায়িত্ববোধ নিয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছি কতটুকু।
দীর্ঘ রোগযন্ত্রনায় ভুগছে কবি শাহিদ আনোয়ার। যাঁর কবিতা আমাদের দেখিয়ে দেয় বর্তমান পৃথিবীর মোনাটোনাসের কথা তাই তিনি উচ্চারণ করেন – ‘কুঁকড়ে আছি মোনাটোনাস গর্ভে/ ধাত্রী আমায় কখন মুক্ত করবে’।
আমরা কি যান্ত্রিক জীবনের সবকিছু তুচ্ছ করি তাঁর সান্নিধ্যে যেতে? একাই লড়ে চলেছেন কবি শেলিনা শেলী। বাস্তবে সব জন্জাল যার কুচকাওয়াজে পরাস্ত হয়েছে, তিনি বড় একা বড় নিঃসঙ্গ প্রিয়জনের রোগের কাছে।
তাই এখনো সময় আছে, আগামী প্রজন্মের কাছে চট্টল সংস্কৃতির সোনালী অতীত আর বর্তমানকে ভবিষ্যতের কাছে শ্রদ্ধায়, সম্মানে রাখতে এগিয়ে আসতে হবে নাট্য ও সংস্কৃতিকর্মীদের। এগিয়ে আসতে হবে সাংবাদিক আর সাহিত্যিকদের কেও।
লেখক-ঃ অধ্যাপক নাট্যকলা বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
পরিচলক-ঃ কথাসুন্দর থিয়েটার।
                                                             

এটি পড়ে দেখতে পারেন

ভালো মানুষের সংখ্যা বাড়ানোর আন্দোলন চাই

ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী ———————————— সমগ্র পৃথিবী দ্রুত উন্নতি হচ্ছে, হবে, হতেই থাকবে কিন্তু মানুষের …